,

সংবাদ শিরোনাম :

‘চামড়ার যে দাম, গলায় দড়ি দেওয়া লাগবে’

ডেস্ক রিপোর্ট : ঈদুল আজহার পর গতকাল শনিবার ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহৎ চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে প্রথম চামড়ার হাট। এই হাটে এবার অন্য বছরের তুলনায় চামড়ার আমদানি ছিল কম। সেই তুলনায় দামও ছিল খুব কম। অন্য বছর এই হাটে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার পিস চামড়া আমদানি হলেও এবার হয়েছে ২০ হাজার পিচের মতো। দাম কম হওয়ায় খুচরা ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির জন্য তারা দায়ী করছে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আড়তদারদের সিন্ডিকেটকে। তবে ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এদিকে যশোরের সীমান্তবর্তী ভারতে চামড়ার দাম বেশি হওয়ায় সেখানে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সূত্র মতে, এ বছর ট্যানারি মালিকরা গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছেন ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা, বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা। দেশে চামড়ার চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় কোরবানির ঈদে।

গতকাল সকালে রাজারহাটে গিয়ে দেখা গেছে, গালে হাত দিয়ে বসে আছেন খুচরা চামড়া ব্যবসায়ী স্বপন দাস। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি গোপালগঞ্জ থেকে ১৭৪ পিস গরুর চামড়া নিয়ে হাটে এসেছেন শুক্রবার রাত ১১টায়। গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত তিনি এক পিস চামড়াও বেচতে পারেননি। দুপুর ১২টার মধ্যে হাট শেষ হয়ে যাবে। চামড়ার দাম অতিরিক্ত কম হওয়ায় হতাশায় মুষড়ে পড়েছেন তিনি। তিনি জানান, হাট পর্যন্ত আনতে ছোট-বড় মিলিয়ে চামড়াপ্রতি তাঁর খরচ হয়েছে এক হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু হাটে চামড়ার দাম বলছে ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা। সব খরচ মিলিয়ে হাটে চামড়া আনা পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। অথচ হাটে যে দাম বলা হচ্ছে তাতে বিক্রি করলে লোকসান হবে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। গত ১০ বছরে হাটের এমন করুণ অবস্থা দেখেননি তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘চামড়ার যে দাম তাতে গলায় দড়ি দেওয়া লাগবে।’

আরেক খুচরা ব্যবসায়ী গোবিন্দ দাস গোপালগঞ্জ থেকে ২২০ পিস গরুর চামড়া নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘রাজারহাট পর্যন্ত চামড়া নিয়ে আসতে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা। অথচ বিক্রি করেছি এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। আমার লোকসান ৭৫ হাজার টাকা। ব্যবসা করতে এসে শেষ হয়ে গেলাম!’

হাটে কথা হয় আরেক খুচরা ব্যবসায়ী শাহজাহানের সঙ্গে। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ট্যানারি মালিক ও এখানকার আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়েছে। ফলে আমরা চামড়ার উপযুক্ত দাম পাচ্ছি না।’

অন্যদিকে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা। বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ‘খুচরা ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করার যে অভিযোগ করেছে তা ঠিক না। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’ এবার হাটে চামড়া কম ওঠার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার আশায় সব চামড়া নিয়ে আসেনি। আশা করছি আগামী হাটে দাম কিছু বাড়বে, আমদানিও বাড়বে।’

বেনাপোল বন্দর থানার ওসি আবু সালেহ মাসুদ করিম বলেন, ‘চামড়া পাচার রোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সীমান্তে কড়া নজর রাখা হয়েছে। গ্রাম পুলিশ, আনসারসহ সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে একটি চামড়াও পাচার হতে না পারে।’

যশোর ২৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফুল হক বলেন, ‘চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে কড়া সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বিজিবিকে। হাটগুলো থেকে ব্যবসায়ীরা যাতে চামড়া ফেরত নিয়ে যেতে না পারে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রধান সড়ক ছাড়া আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে কেউ যাতে চামড়া আনা-নেওয়া করতে না পারে সে জন্য বিজিবি সতর্ক রয়েছে।’

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *